দক্ষিণ আফ্রিকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫ জনের বাড়ী আলীরটেক ও বক্তাবলীর তিন গ্রাম চলছে স্বজনদের আহাজারি

সিটিভি নিউজ, এম আর কামাল, নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ =====================
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন (বর্তমান কোমানি) এলাকার সমোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৫ জনই নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার বাসিন্দা। মর্মান্তিক এ ঘটনায় আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের তিনটি গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জেলার এই চরাঞ্চলের গ্রামগুলো পাশাপাশি হওয়ায় শোক যেন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জনপদে। নিহতদের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি, বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে কান্নায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি সূত্রের বরাত দিয়ে নিহতের স্বজনেরা জানান, কুইন্সটাউনের শ্রম এলাকায় একটি সুপারশপে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সময় ভেতরে থাকা বাংলাদেশিরা বের হতে না পেরে দগ্ধ হন। এতে ঘটনাস্থলেই ছয়জনের মৃত্যু হয়।
বুধবার দুপুরে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি উঠোনেই স্বজন আর প্রতিবেশীদের ভিড়। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ নীরবে বসে আছেন। কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনার সামনে কোনো কথাই যেন কাজে আসছে না।
আলীরটেক ইউনিয়নের মধ্য ক্রোকের চরের নির্মাণাধীন একটি বাড়ির সামনে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। নিহত মো. আপন আহমেদ (২২)-এর মা আঁখি বেগম ছেলের শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। বিলাপ করে তিনি বলেন, আমার পুতেরে আইন্না দেও।
নিহত আপনের বড় ভাই সৌদি প্রবাসী মো. জুয়েল জানান, চার বছর আগে জীবিকার তাগিদে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান তার ভাই। গত সোমবারও কথা হইছিল। ওর স্বপ্ন ছিল বাড়িটা পাকা করবে, বাবা-মাকে নিয়ে থাকবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। শুনেছি লাশ পুড়ে গেছে। অন্তত ছাইটুকু দেশে আনতে পারলে কবর দিতে পারতাম।
বাবা আলী আহমদ বলেন, ছেলেটা খুব কষ্ট করে সংসার চালাইত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, রোজা রাখত। এখন আমার ঘরটাই অন্ধকার হয়ে গেল।
একই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন একই এলাকার ফাহিম, নুর মোহাম্মদ, তৈলখিরার চরের ফয়সাল, বক্তাবলী ইউনিয়নের শাহীন এবং মুন্সিগঞ্জের রাজ্জাক।
শাহিনের চাচা মোক্তার হোসেন বলেন, নয় বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিল। কয়েক দিন ধরেই বলত, ওখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো না। দেশে ফিরতে চাচ্ছিল। কিন্তু আর ফেরা হলো না।
পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন ফাহিমের স্বজনরা জানান, মো. ফাহিম প্রায় ১১ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতেই বিদেশে থেকে কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি। তার উপার্জনেই চলত পুরো সংসার।
ফাহিমের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর বাবা মনির হোসেন নির্বাক হয়ে পড়েছেন। মা ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ি।
ফাহিমের ভগ্নিপতি মো. সজীব বলেন, ফাহিমের পাঠানো টাকাতেই পুরো সংসার চলত। এখন আমরা কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
একই ঘটনায় আলীরটেকের ক্রোকেরচর গ্রামের তিনজন, তৈলখিরারচর গ্রামের একজন এবং বক্তাবলীর কানাইনগর গ্রামের একজন নিহত হওয়ায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভিড় করছেন। সবাই নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন।
একই গ্রামের নূর মোহাম্মদ (৫৫)-এর মৃত্যুতেও শোকাহত পরিবার। তার তিন বোন ও স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। পরিবার জানায়, ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান তিনি। তার উপার্জনে দুই মেয়ের বিয়ে হয় এবং ছোট ছেলে সিয়াম এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
নূর মোহাম্মদের ভাগনি ফিমা আক্তার বলেন, মামা দেশে ফিরবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু এভাবে ফিরবেন ভাবিনি।
একই ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রবাসী মো. ফাহিম, যিনি প্রায় ১০ বছর আগে পরিবারের দায়িত্ব নিতে বিদেশে যান। তার উপার্জনে দুই বোনের বিয়ে এবং যমজ দুই ভাইয়ের পড়াশোনা চলছিল। পরিবারের ইচ্ছা ছিল, দেশে ফিরলে তার বিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেই আশা অপূর্ণই থেকে গেল।
ফাহিমের মৃত্যুর খবরে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার বাবা মনির হোসেন। মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো বাড়ির পরিবেশ।
প্রায় আট বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিলেন নূর মোহাম্মদ। এর আগে ১০ বছর কাজ করেছেন সিঙ্গাপুরে। দেশে স্ত্রী কামরুন নাহার, দুই মেয়ে সায়মা ও সাদিয়া এবং একমাত্র ছেলে সিয়াম আছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলে সিয়াম এবার নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
শেষ ফোনালাপের বিষয়ে বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সিয়াম। তিনি বলেন, বাবা সবার খোঁজখবর নিলেন। আফ্রিকার পরিস্থিতির কথা বললেন। বললেন, দেড় বছরের কাগজ হাতে পেয়েছেন। কাগজ না পেলে দেশে ফিরে আসতে হতো। কে জানত, এটাই শেষ কথা হবে!।
কান্নার একপর্যায়ে আক্ষেপ করে সিয়াম বলেন, বাবা আমাদের জন্য কষ্ট করতে গিয়ে পুরো জীবনটাই প্রবাসে কাটিয়ে দিলেন। এখন আর বাবা বলে ডাকার কেউ রইল না।
স্থানীয়রা জানান, নিহতদের অধিকাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুর ফলে পরিবারগুলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বজনরা বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন। স্বজনদের ভাষ্য, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং মরদেহ দেশে আনার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরাও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ওই সুপারশপের মালিক নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রওশন আলী। তিনি বলেন, দোকানের আবাসিক কক্ষে সাতজন ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ছয়জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তিনি আরো জানান. আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণে আগুন লাগতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করছে স্থানীয় পুলিশ। তিনি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন জানান, নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলায়। আরেকজনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ভুক্তভোগী পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি এবং আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দিয়েছি। সকল প্রক্রিয়া শেষে যত দ্রুত নিহতের মরদেহ দেশে আনা যায় স্বজনদের এই দাবি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করবো।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, এখনো পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো তালিকা পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের চারজন এবং বক্তাবলী ইউনিয়নের একজনসহ মোট পাঁচজন ওই ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে ইতিমধ্যে কথা বলা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। দূতাবাস থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা হবে।
তিনি আরো জানান, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা চাওয়া হলে তা দ্রুত নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মরদেহ দেশে আনা, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিদের নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে পরিবারগুলো কোনো ধরনের জটিলতার মুখে না পড়ে।
জেলা প্রশাশক জানান, প্রবাসী কল্যাণ শাখার সহকারী পরিচালকের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। পরিবারগুলোর সঙ্গে তার যোগাযোগ স্থাপন করা হবে, যাতে মরদেহ দেশে আনা, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন এবং প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। সংবাদ প্রকাশঃ ৩০-০৭-২০২৬ ইং সিটিভি নিউজ এর (সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে দয়া করে ফেসবুকে লাইক বা শেয়ার করুন) (If you think the news is important, please share it on Facebook or the like> See More =আরো বিস্তারিত জানতে কমেন্টসে লিংকে ছবিতে ক্লিক করুন= ==আরো =বিস্তারিত জানতে কমেন্টসে নিউজ লিংকে ক্লিক করুন=

(সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে দয়া করে ফেসবুকে লাইক বা শেয়ার করুন) (If you think the news is important, please share it on Facebook or the like)
আরো পড়ুন