আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সক্রিয় একাধিক গ্রুপ

সিটিভি নিউজ, এম আর কামাল, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান : সংঘাতের অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার মেঘনা নদী বেষ্ঠিত দ্বীপ কালাপাহাড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত ঘটাতে সক্রিয় রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক একাধিক গ্রুপ। যে কোন সময় ঘটতে পারে ভয়াবহ সংঘর্ষ। ইতিমধ্যে তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় ঘটছে ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা। ব্যবহার হয়েছে দেশীয় অস্ত্রের পাশপাশি আগ্নেয়াঅস্ত্র। তাদের প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ্য মদদে ও সরাসরি নেতৃত্বে প্রতি বছরই এই জনপদে খুনোখুনির ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এ পর্যন্ত সংঘর্ষে ১৩ জন খুন হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, এক সময়ের শান্তি প্রিয় এই জনপদ এখন ক্রমেই ‘মৃত্যুপুরি’তে পরিণত হয়েছে। তবে ভয়ে মুখ খোলতে সাহস পায়না কেউ। স্থানীয়দের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই জানিয়েছেন, বিশাল আয়ের উৎস বালু মহল ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েক বছরের ব্যবধানে বেশ কিছু মারামারি ও খুনের ঘটনা ঘটছে। প্রাণভয়ে এরই মধ্যে অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া ঘটনায় মামলায় বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি আসামি হয়েছেন। গ্রেফতার এড়াতে অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে নানা জটিলতায় মামলাগুলোর অধিকাংশের তদন্ত কাজ ঝুলে আছে।
জানা গেছে, আদালত থেকে এরই মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে পারছেনা কিন্তু তাদের অনেকেই এলাকায় দেখা য়ায় বলে এলাকাবাসী জানায়। এতে বাড়ছে বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতা। নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছে এই ইউনিয়নের বাসিন্দারা। একটি পুলিশ তদন্ত কন্দ্রে থাকলেও তাতে নিরাপত্তায় তেমন কোনো ভুমিকা রাখতে পারছে না।
স্থানীয়রা আরও জানান, প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা জুয়ার আসর বসাচ্ছে। সব কিছু যেনেও রহস্যজনক কারণে আইনশঙ্খলা বাহিনীর লোকজন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে ধীরে ধীরে পুরো এলাকার সামাজিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। সরকার দলীয় বাহিনীর সদস্যরা বালু মহাল থেকে শুরু করে স্থানীয় বিচার-সালিশে আধিপত্য বিস্তার করছেন। অজানা এক আতংকের মধ্যে বসবাস করছেন কালাপাহাড়িয়াবাসি। তবে সম্প্রতি জেলার পুলিশের সিনিয়র এএসপি মাহিন ফরাজীর নেতৃত্বে ও আড়াইহাজার থানার ওসি নজরুল ইসলামের অংশ গ্রহণে পুলিশের ৫০ সদস্যের একটি দল অভিযান চালায়। এতে কিছুটা হলেও জনমনে স্বস্তি ফিরেছে বলে অনেকেই মনে করেন। তবে একাধিক গ্রুপের বিচরণ থাকলেও তাদের মূলত নেতৃত্বে রয়েছে তিনজন। গ্রুপের আলাদা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক তিন ব্যক্তি। সম্প্রতি পুলিশ তাদের বাড়িঘর তল্লাশি অভিযান চালায়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, তাস খেলা ও বাগান থেকে আম পাড়ায় বাঁধা দেয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সম্প্রতি গুলিবিদ্ধ হয়ে আয়ুব আলী (১৪) নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়। সে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের স্থানীয় ইজারকান্দী পূর্বপাড়া এলাকার মৃত জালাল উদ্দিনের ছেলে এবং স্থানীয় কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। মৃতের পরিবারের অভিযোগ কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন তাকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করলে তার মৃত্যু হয়। সাদ্দাম হোসেকে প্রধান আসামি করে মামলায় ২৩ জনকে। (মামলা নং- ১৪(৫)২০২০ইং)। ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন গং ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হক সাব গংয়েরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এছাড়াও ইজারকান্দি এলাকায় রব মিয়া নামে কাঁঠ মিস্ত্রী হত্যাকান্ডের ঘটনায় একটি মামলা হয়। (যাহা নং- ২০(৯)১২ইং)। একই মামলার বাদীর হাতের কব্জি কাটার ঘটনায় তার নামে আরো একটি মামলা হয়। (যাহা নং- ১৬(২)২০২০ইং)। ২০১৮ সালে মেঘনা নীদতে জোড়া (চাঁই) পাতাকে কেন্দ্র করে মধ্যাচরে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দুইজন নিহত হয়। পরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এনে দুইটি হত্যা মামলা করা হয়। স্থানীয় সুজনগং ও বাবুল গংয়ের মধ্যে বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটেছিল। এতে ঘটনাস্থলে সুজন (২৫) এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোজীনা (২৮) মারা যায়। এ ঘটনায় নিহত সুজনের ভাই রবি মিয়া বাদী হয়ে ৩০ জনের নাম উল্লেখ্য করাসহ অজ্ঞাত আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। নিহত রোজীনার স্বামী বাবুল বাদী হয়ে করা অপর মামলায় ৩০ জনের নাম উল্লেখ্য করাসহ আরও ৫ থেকে ৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
২০২০ সালে পুলিশ একটি হত্যা মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করাকে কেন্দ্র করে মামলার বাদির বাড়িতে হামলা করা হয়। ওই সময় রনি নামে এক যুবককে কুপিয়ে দেহ থেকে তার এক হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। পরে থানায় জোসনা নামে একনারী বাদি হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতিসহ তার সহযোগি আরো ১০ জনের নাম উল্লেখ্য করাসহ অজ্ঞাত আরো ৩ থেকে ৪ জনকে আসামি করা হয়েছিল। রনির পিতা রউফ মিয়া হত্যাকান্ডের শিকার হন। পরে ভাই মাঈন উদ্দিন বাদি হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। আবদুল্যাহ নামে এজাহার নামীয় এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১১ সালের ১৬ জুন রাতে কদমির চর এলাকা থেকে আসামি গ্রেপ্তার করতে যায় খাগকান্দা নৌ ফাঁড়ি, তৎকালিন কালাপাহাড়িয়া পুলিশ ফাঁড়ি ও আড়াইহাজার থানাসহ ২৫ জন পুলিশ সদস্য। পুলিশ আওয়ামী লীগ নেতা একেএম ফাইজুল ইসলাম ডালিমের সমর্থক হত্যা মামলার ৪ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আসামিদের নিয়ে ট্রলারে করে ফেরার পথে মেঘনা নদীতে বাল্কহেড (বালুবাহী) ট্রলার নিয়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একদল লোক পুলিশকে ধাওয়া করে। এ সময় বালুবাহী ট্রলার দিয়ে পুলিশের ট্রলারকে ধাক্কা দেয়। এতে নদীতে পড়ে গিয়ে খাগকান্দা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) নাসির সিরাজী নিখোঁজ হন। এদিকে ২০২০ সালে রাধানগর এলাকায় দুইপক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নাদিরা ও তার বোন জুলির মাথা ইটের আঘাতে থেঁতলে যায়। তারা একই এলাকার জোহর আলীর মেয়ে। স্থানীয় তাজি মাতাব্বর ও ৪নং ওয়াডেঅর ইউপি সদস্য ইব্রাহিম গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। রাধানগর এলাকায় ২০১৫সালের ২১ ফ্রেরুয়ারি পূর্বশক্রতার জের ধরে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় টেঁটাবিদ্ধ হয়ে ইমান আলী (৩৫) নামে এক যুবককের চোখ উপড়ে যায়। সে মিয়া আলীর ছেলে। ৪ নং ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য আরশ আলী ও সাবেক সদস্য আব্দুল কাদির গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের এই ঘটনা ঘটে।
আড়াইহাজার থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি পুলিশের কমবাইন্ড অভিযানের পর এলাকায় মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে। এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাদের খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি আরো বলেন, কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের জনগণের আস্থা ও এলাকায় সু¯ ’পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পুলিশ আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।

সংবাদ প্রকাশঃ  ২০২০২০ইং (সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে দয়া করে ফেসবুকে লাইক বা শেয়ার করুন) (If you think the news is important, please share it on Facebook or the like সিটিভি নিউজ@,CTV NEWS24   এখানে ক্লিক করে সিটিভি নিউজের সকল সংবাদ পেতে আমাদের পেইজে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুনসিটিভি নিউজ।। See More =আরো বিস্তারিত জানতে লিংকে ক্লিক করুন=

Print Friendly, PDF & Email