কুমিল্লায় মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে

সিটিভি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন
সিটিভি নিউজ।।     সাইফুল ইসলাম ফয়সালঃ সংবাদদাতা জানান ====
সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় আবারো বেড়েছে মাদকের আগ্রাসন। ভারত সীমান্তবর্তী এ জেলার ৫টি উপজেলার ১০৫ কিলােমিটার অংশই ভারত সীমান্তবর্তী। আর এই সীমান্তের শতাধিক অরক্ষিত রুট দিয়ে দেদারসে  মাদক প্রবেশ করছে দেশে। কুমিল্লা হয়ে রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। এ ছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবার বড় বড় চালান। আগে শুধুমাত্র মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান এলেও এখন ভারত সীমান্ত দিয়েও ফেন্সিডিল, গাঁজা, মদ, বিয়ার সহ ইয়াবাও। কুমিল্লা থেকে রাজধানী ঢাকার পরিবহন সুবিধার কারনে মাদক পাচার ও কারবারের ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে কুমিল্লা। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিমানে ইয়াবা ও মাদকের চালান যাচ্ছে বিদেশেও। আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে প্রতিদিনই মাদক কারবারি আটক এবং মাদকদ্রব্য জব্দ করা হলেও দেশে প্রবেশকৃত মাদকের তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। মাদকের সহজ লভ্যতার ফলে সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদকসেবীদের আনাগােনা বেড়েছে পূর্বের চেয়ে। অপরদিকে চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে মাদক কারবারিদের তৎপরতাও বেড়েছে। পুরনো চিহ্নিত ব্যবসায়ীদের সাথে যোগ হয়েছে নতুন কারবারি। কাঁচা টাকার লোভ ও বেকারত্বের কারনে  রাতারাতি বড়লোক হওয়ার নেশায় বিপথগামী হচ্ছে কিশোর, তরুণ ও যুবক সহ বিভিন্ন বয়স ও নানা শ্রেণী পেশার লোকজন। নারী মাদক কারবারিদের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। শুধু মাদকই নয়, সীমান্তের স্পটগুলো দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে স্রোতের মতই আসছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও চোরাইপণ্যও। জেলা আইনশৃংখলা কমিটি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে জেলায় মােট ৪৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭৫টি মামলা হয়েছে
মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত। চোরাচালান মামলা হয়েছে ১২টি। এ ছাড়াও একই সময়ে র‌্যাব-বিজিবি- পুলিশ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত এক মাসে আনুমানিক প্রায় ৫ কোটি টাকার মাদক ও চোরাইপণ্য জব্দ করেছে। আর চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনের প্রতিদিনই জেলার কোনাে না কোনাে এলাকা থেকে মাদক উদ্ধার ও মাদক ব্যবসায়ী আটকের খবর পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ছােটখাটো মাদক ব্যবসায়ী কিংবা মাদকে বাহনকারী আটক হলেও বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় দেশী ও আন্তর্জাতিক মাদক মাফিয়ারা। বড় কোনাে অভিযানের পর কিছুদিন নিরব থাকলেও অল্প কদিন পরই আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে মাদকের বড় ডিলাররা।  সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের আগ্রাসন আবারো বেড়ে যাওয়ায় বিপথগামী হয়ে পড়ছে তরুণ ও যুবসমাজ। সমাজের অধিকাংশ অপরাধ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় কোন না কোন ভাবে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে অপরাধ কান্ডের পেছনে। এদেকে সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা ও মাদকসেবীদের আনাগােনা বেড়ে যাওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায় সর্বশেষ ঘটে যাওয়া দুই বহুল আলােচিত ঘটনা থেকে। গত ৭ এপ্রিল রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজী- লালবাগ এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে গােলাগুলির ঘটনা ঘটে ‌র‌্যাবের সাথে। এতে গুলিবিদ্ধ হন র‌্যাব সদস্যসহ তিন মাদক ব্যবসায়ী। পরে এ ঘটনায় আটজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে গত ১৩ এপ্রিল রাতে। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় হায়দ্রাবাদ এলাকায়। সাংবাদিকতা করতেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে চাকরি নিয়ে মাদক নির্মূলের ইচ্ছে পোষণকারী যুবক মহিউদ্দিন সরকার নাঈম। মাদক পাচারের তথ্যা দেয়ার কথা বলে বুড়িচং সীমান্ত এলাকায় নিয়ে নির্মম ভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলােচনা সমালোচনা চলছে বাংলাদেশ এমনকি ওপার বাংলায়ও। ইতােমধ্যেই প্রধান হত্যাকারী কুমিল্লার সীমান্ত এলাকার অস্ত্র ও মাদকের ডন হিসেবে পরিচিত রাজু র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে গোলাবাড়ি সীমান্তে নিহত হয়েছে। সাংবাদিক হত্যাকান্ডের এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযােগে চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সচেতন মহল বলছে, মাদকের আগ্রাসন ও সীমান্তে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য  কতটা বেড়েছে সর্বশেষ ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনাই তার প্রমাণ। সাংবাদিক হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা ও গুলি করা যেন একটি সহজ বিষয় হয়ে উঠেছে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। বিষয়টি সচেতন নাগরিক এবং সাধারণ মানুষের কাছে যেমন উদ্বেগ ও শঙ্কার তেমনি তা ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও।
সীমান্তের বড় বড় মাদকের ডিলারদের বেশির ভাগই ভারত বাংলাদেশের দৈত নাগরিক হওয়ায় অপরাধ কর্মের পর সুবিধামত  যে কোন দেশে অবস্থান করা সহজ হওয়ায় বেপরোয়া হয়ে পরেছে অপরাধী ও চোরাকারবারিরা।
মাদকের প্রধান বাজার বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে ত্রিপুরার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় হচ্ছে গাঁজার চাষ, গড়ে উঠেছে ফেন্সিডিল ও ইয়াবার কারখানা। শুধু মাত্র বুড়িচং উপজেলার সীমান্ত এলাকায় রয়েছে ২শতাধিক মাদকের ডিলার যাদের মাঝে শতাধিক মাদক কারবারি ভারত বাংলাদেশের দৈত নাগরিক। বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় দেশের নাগরিক সনদও রয়েছে তাদের। অভিযোগ রয়েছে দুই দেশের সীমান্তরক্ষি বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্যদের ম্যানেজ করে মাদকের রমরমা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে তারা। আন্তর্জাতিক সীমানা জটিলতায় হত্যা, ডাকাতি, স্মাগলিং সহ গুরুতর অপরাধে জড়িত অপরাধীদের অভয়ারণ্য অরক্ষিত এসব সীমান্ত এলাকাগুলো।
সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় মাদকের আবহতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে একমত পােষণ করে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) এম তানভীর আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার হচ্ছে। গােটা কুমিল্লায় মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। মাদক প্রতিরােধে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও প্রতিরােধ গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবকরাও সন্তানদের প্রতি নজর রাখতে হবে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তা খেয়াল রাখতে হবে’। কেবল মাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয় সামাজিক সচেতনতা না বাড়লে মাদকের প্রসার কমবে না বলেই মনে করেন তিনি।
জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক চৌধুরী ইমরুল হাসান বলেন, মাদক নির্মূলে প্রতিনিয়ত কাজ করছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কুমিল্লায় মাদকের প্রভাব তুলনামূলক বেশী। সীমান্তে আরো কড়া নজরদারি প্রয়োজন। মাদকের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন সভা সেমিনার করা হচ্ছে। মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি এ থেকে রক্ষা পেতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কে সুস্থ স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ নাগরিক সহ সকলের সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের উচিৎ মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অবৈধ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সবসময় সচেষ্ট রয়েছে।
কুমিল্লার সীমান্তবর্তী বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল ইউনিয়নের আনন্দপুর এলাকার ইউপি সদস্য লিটন রেজা বলেন, ‘সীমান্তে দিন দিন মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বেড়েই চলেছে। আনাগােনা বেড়েছে মাদকসেবীদেরও। প্রতিদিনই শহর থেকে মােটরসাইকেলের বহর নিয়ে মাদক সেবন করতে এদিকে আসছে যুবক ও তরুণরা। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের মাথাপিছু ১০০-২০০ টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে সীমান্ত টপকে ভারতে প্রবেশ করে মাদক সেবন করে আসে। তাদের এ প্রবণতা রুখতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে’।
 এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, মাদক নির্মূলে কুমিল্লায় পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে, তা আরও জোরদার করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরাে টলারেন্স অবস্থানে রয়েছে। মাদক সংশ্লিষ্ট কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। যাদের মাদক কারবারিদের সাথে সম্প্রক্ততা রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে  তাদের তালিকাও রয়েছে। হয় মাদক ছাড়তে হবে নয় কুমিল্লা ছাড়তে হবে। পাশাপাশি মাদক কারবারিদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তার আহ্বানও জানান তিনি।সংবাদ প্রকাশঃ  ২৬-০-২০২২ইং সিটিভি নিউজ এর  (সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে দয়া করে ফেসবুকে লাইক বা শেয়ার করুন) (If you think the news is important, please share it on Facebook or the like  See More =আরো বিস্তারিত জানতে ছবিতে/লিংকে ক্লিক করুন=  

Print Friendly, PDF & Email